মঙ্গলবার ২১ এপ্রিল ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বঙ্গাব্দ
আন্তর্জাতিক

ধ্বংসস্তূপের উপর দাঁড়িয়ে রমজানকে স্বাগত জানাল গাজাবাসী

নবীন নিউজ ডেস্ক ০২ মার্চ ২০২৫ ০৯:১০ এ.এম

সংগৃহীত ছবি সংগৃহীত ছবি

যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় ফের মাহে রমজানের আগমন ঘটেছে। গোটা বিশ্ব যখন আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশে রমজান পালন করবেন, আমরা তখন নানামুখী দুঃখ, কষ্ট আর শত ক্লেশ নিয়ে এ মাস পার করবো। 

যুদ্ধের বাজনা এখনো পুরোপুরি থামেনি। চলমান যুদ্ধবিরতি যে স্থায়ী হবে তারও বিন্দুমাত্র গ্যারান্টি নেই। কখন কী ঘটে তা নিয়ে মানুষ উদ্বিগ্ন। সবার একটাই ভয়, হয়তো যুদ্ধ আবার ফিরে আসবে!

গত বছরের যুদ্ধের ভয়াবহতা এখনো আমাদের স্মৃতিপটে দোলা দেয়। এখনো ট্রমায় আছি। সেই ভয়াল স্মৃতি বিস্মৃত হয়নি। 

২০২৪ সালেই শুধু যুদ্ধের মধ্যে আমরা রোজা কাটিয়েছি এমন নয়। এর আগেও রমজান মাসের বহু রাতে আমরা বোমা হামলার মুখে পড়েছি। আমাদের অনেক রাত অতিক্রান্ত হয়েছে ভয় আর বুকভরা কষ্ট নিয়ে। 

আমার বয়স তখন নয় বছর। আমার এখনো মনে পড়ে, সেই বয়সেও রোজার রাতে কিভাবে আমাদের উপর বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছিল। সেই স্মৃতি কখনো ভোলার নয়। 

গতবারের রোজা ছিল তখনকার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি ভয়াবহ। চারদিকের প্রায় সবাই ছিল অভুক্ত আর অনাহারী। সেহরি খাওয়ার মতো খাবারও পাননি অনেকে। 

সারাদিন রোজা রাখার পর আমরা ছয়জন মিলে শুধু একটা ক্যানের বোতল (মটরশুটির পানীয়) ভাগ করে পান করতাম। সারাদিন বিদ্যুৎ থাকতো না। অন্ধকারের মধ্যে টেবিলের নিচে লুকিয়ে আমরা স্বাদহীন কিছু খাবার চিবিয়ে ইফতার করতাম। এমনভাবে আমরা লুকিয়ে থাকতাম একজন আরেকজনের চেহারাও দেখতে পেতাম না।

আমাদের মধ্যে বেশিরভাগই পরিবারের কাছ থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছিলাম। আমার দাদি, ফুফু এবং চাচাতো ভাই-বোন সবাই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। সংযোগের মাস যেন বিচ্ছিন্নতার মাসে পরিণত হয়েছিল। 

রমজানের আলাদা আনন্দ রয়েছে। সারাদিন উপবাসের পর মাগরিবের আযানটা খুব মধুর লাগে। সেহরির সময় ফজরের আযানও বেশ আনন্দের। তবে সেই আযান শোনা থেকে আমাদের বঞ্চিত করা হয়েছিল। কোথাও কোনো আযানের ধ্বনি শোনা যায়নি তখন। প্রায় সব মসজিদ ধসে দিয়েছিল তারা। অনেকে আযান দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তারা ভয়ে আযান দেননি। যদি আযানের সেই ধ্বনির কারণে তাদের উপর আবারও বিমান হামলা হয়!

মুয়াজ্জিনের সুললিত কণ্ঠ শুনে রোজা ভাঙার সময় আমরা ক্ষেপণাস্ত্র ও গুলির শব্দ শুনে ইফতার করেছি। 

যুদ্ধের আগে, সাধারণত পরিবারের সঙ্গে ইফতারের পর মসজিদে যেতাম মাগরিবের নামাজের জন্য। এ সময় প্রতিবেশী অনেকের সঙ্গেই দেখা হতো। গাজার রাস্তায় হাঁটতাম, সবার সঙ্গে আড্ডা দিতাম। তখন রোজার আমেজ ছিল বেশ আনন্দের। তবে গত বছর তারাবির জন্য আমরা কোনদিন কোথায় গিয়েছি তার কোনো ঠিক ছিল না। 

গাজার সবচেয়ে সুন্দর ও ঐতিহাসিক মসজিদ গ্রেট ওমারি মসজিদও ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। আমার বাবা ও ভাই রমজানের শেষ দশদিন সেই মসজিদে ইতিকাফ করতেন, কুরআন পড়তেন। সেই প্রিয় মসজিদটিও রক্ষা পায়নি হামলার কবল থেকে। সেখানে এখন ময়লার স্তূপ জমে আছে। 

এবার রোজা শুরু হয়েছে যুদ্ধবিরতির মাঝে। তেমন ভয়-ভীতি নেই। বিমান হামলার কারণে রোজা ভাঙার শঙ্কা নেই। ফজরের নিরবতা বিঘ্নিত করার জন্য বিস্ফোরণও নেই। গাজার বিভিন্ন স্থানে এবার রঙ-বেরঙের বাতি জ্বলছে। 

যেসব দোকানপাট বা মার্কেট যুদ্ধে ধ্বংস হয়নি সেগুলো আবার খুলে দেওয়া হয়েছে। গাজার সড়কগুলোতে ফের রমজানের আমেজ ফিরে আসতে শুরু করেছে।

যুদ্ধে ৪৮ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছেন। অনেক পরিবারে হয়তো সবাই-ই এ যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন। এবার আর তারা ইফতার করতে পারবেন না। কেউ পিতা হারিয়েছেন, কেউবা একমাত্র পুত্রকে হারিয়ে সন্তানহারা হয়েছেন। ইফতারের টেবিলে বসলে এবার হয়তো পরিবারের হারানো সেই সদস্যকে মনে পড়বে তাদের। সেই আসন এবার ফাঁকা থাকবে। আগের রমজানে যে মায়ের হাতে বানানো ইফতার খেয়েছেন সন্তান সেই মা হয়তো এবার ইফতার বানাতে পারবেন না। আগ্রাসী হামলায় তিনিও হয়তো নিহত হয়েছেন। 

আমিও আমার খুব কাছের মানুষ হারিয়েছি। আমার ফুফা। তিনি প্রতি রোজায় আমাদেরকে দাওয়াত করতেন। কিন্তু যুদ্ধে বর্বরভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে। আমার বান্ধবি সায়মা, লিনা, রোয়াকেও হারিয়েছি। প্রতি বছর রমজানে তারাবির পর তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হতো।

এবার রমজান এসেছে ঠিকই, কিন্তু সেই আনন্দ আর উৎসবমুখর পরিবেশ নেই। 

রমজান রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। এখনই সময় আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার। ঈশ্বরের নৈকট্য লাভ এবং আধ্যাত্মিক সম্পর্ক স্থাপনের মোক্ষম সময় রমজান। 

আমাদের মসজিদগুলো হয়তো তারা ধ্বংস করতে পেরেছে। তবে আমাদের বিশ্বাসকে তারা বিন্দুমাত্র নড়বড়ে করতে পারেনি। ধসে যাওয়া বাড়ির নিচে তাবু গেড়ে এখনো আমরা তারাবিহ পড়ছি, কুরআন পড়ছি, দোয়া ও মুনাজাতে আমাদের সব প্রত্যাশা প্রভুর কাছে দু’হাত তুলে চাইছি। বিশ্বাস করি, আল্লাহ আমাদের নিদারুণ কষ্টের জন্য উত্তম পুরস্কৃত করবেন।

অনুবাদ: সজীব হোসেন
লেখক: শিক্ষার্থী, ইংরেজি সাহিত্য বিভাগ, ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব গাজা। 

নবীন নিউজ/পি

এই সম্পর্কিত আরও খবর

আরও খবর

news image

আফগানিস্তানে বর্ণ ও দাসপ্রথাকে আইনি স্বীকৃতি, আলেমরা অপরাধ করলে দায়মুক্তি

news image

না ফেরার দেশে সৌদির সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তি, রেখে গেলেন ১৩৪ বংশধর

news image

জাতিসংঘের ও আন্তর্জাতিক ৬৬ সংস্থা থেকে বেরিয়ে যাবার ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের

news image

২য় বিয়ে করলে ৭ বছর কারাদণ্ড

news image

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে কতটা প্রভাব ফেলবে ‘হাসিনা ইস্যু’

news image

পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে ব্যাপক গোলাগুলি, নিহত ২৩ জন

news image

২৬ জন বাংলাদেশীকে নিয়ে লিবিয়া উপকূলে নৌকাডুবি, ৪ জনের মৃত্যু

news image

বিবিসির কাছে থেকে ৫০০ কোটি ডলার চাইতে পারেন ট্রাম্প

news image

শাটডাউনে যুক্তরাষ্ট্রে ৩ হাজারের বেশি ফ্লাইট বাতিল

news image

থাই-মালয়েশিয়া সীমান্তে নৌকাডুবিতে ৭ রোহিঙ্গার মৃত্যু, ২ বাংলাদেশি উদ্ধার

news image

দূষণে প্রতিদিন ১৬০ জনেরও বেশি মৃত্যু

news image

মালয়েশিয়ায় পাচারকালে নৌকাডুবি, বাংলাদেশিসহ ৬ জন উদ্ধার

news image

বাংলাদেশ সীমান্তে সেনাসমাবেশ বাড়াচ্ছে ভারত, ৩০ কিমির মধ্যে ৩ ঘাঁটি

news image

নেতানিয়াহুসহ ৩৭ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি

news image

পাকিস্তানে ৬০০ বিলিয়ন ডলারের স্বর্ণের খনি আবিষ্কার!

news image

ফিলিপাইনে টাইফুন কালমেগি: মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১১৪

news image

মারা গেলেন ইরাক ধ্বংসের অন্যতম হোতা ডিক চেনি

news image

যুক্তরাজ্যে ট্রেনে ছুরিকাঘাতে আহত ১০

news image

যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় হামলা আইডিএফ'র, নিহত ২

news image

গাজায় ভয়াবহ বিমান হামলা শুরু করল ইসরাইল

news image

ইরানে ‘মোসাদ গুপ্তচরের’ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর

news image

ঘর আর নেই, তবু ঘরে ফিরছে গাজাবাসী

news image

‘শিশুদের নোবেল’ পুরস্কারে জন্য মনোনীত রাজশাহীর মুনাজিয়া

news image

৭৫ বছরে বিয়ে করে বাসর ঘরে বৃদ্ধের মৃত্যু

news image

গাজামুখী নৌবহর আটকে ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযান

news image

চিকিৎসকদের হাতের লেখা ঠিক করতে বললেন আদালত

news image

এবার নেতানিয়াহুকে নিষেধাজ্ঞা দিল স্লোভেনিয়া

news image

সুদানে মসজিদে ড্রোন হামলায় নিহত অন্তত ৭৮ জন

news image

শ্যালিকাকে নিয়ে পালালেন দুলাভাই, দুলাভাইয়ের বোনকে নিয়ে চম্পট শ্যালক!

news image

ইসরায়েলি হামলার ভয়ে চীনা আকাশ প্রতিরক্ষা মোতায়েন করল আরেক মুসলিম দেশ