রবিবার ৩১ মে ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বঙ্গাব্দ
ধর্ম

কিয়ামতের আগে সিরিয়া অঞ্চলে যে আশ্চর্য ঘটনাগুলো ঘটবে

নবীন নিউজ, ডেস্ক ১১ ডিসেম্বার ২০২৪ ০৯:৪৭ পি.এম

সংগৃহীত ছবি

আপনি কি জানেন, পৃথিবীতে এমন একটি পবিত্র ভূমি রয়েছে যার চারপাশে ফেরেশতারা নিজেদের ডানা মেলে রাখেন? আর সেই ভূমিই হবে কিয়ামতের দিন সকল মানবজাতির সমবেত হওয়ার স্থান। এ ভূমি সম্পর্কে কোরআন ও হাদিসে এমন অনেক বিস্ময়কর কথা বলা হয়েছে, যা জানলে আপনি মুগ্ধ না হয়ে পারবেন না। চলুন, জেনে নেই শামের বরকতপূর্ণ ভূমির আশ্চর্য ইতিহাস।

একদিন আসবে, যখন শাম ভূমি হবে ঈমানদারদের শেষ আশ্রয়স্থল। পৃথিবীজুড়ে ফিতনা ছড়িয়ে পড়লেও এখানকার ভূমি থাকবে নিরাপদ। আল্লাহর ফেরেশতারা এই অঞ্চলে ছায়া দান করবেন। নবী ইসা আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবতরণ করবেন এই ভূমিতে। আর এখানেই সমাপ্তি ঘটবে পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর শত্রু দাজ্জালের।

শুরুতেই এই প্রশ্ন মাথায় আসতে পারে—এমন ভূমির কথা বলা হচ্ছে, সেটি কোনটি? প্রাচীন যুগে যাকে বলা হতো ‘মুলকে শাম’, সেটিই আজকের সিরিয়া, জর্ডান, লেবানন এবং পূর্ণ ফিলিস্তিনের সমন্বিত অঞ্চল। এই ভূমি শুধু ভৌগোলিকভাবে নয়, ইসলামের ইতিহাসে, নবী-রাসুলদের স্মৃতিতে এবং কোরআন-হাদিসে বিশেষভাবে উল্লেখিত। চলুন জেনে নিই, কীভাবে এই বরকতময় ভূমি কিয়ামতের আগে অনন্য ঘটনাবলির কেন্দ্রবিন্দু হবে।

শাম ভূমির বরকতময়তা

কোরআনে বহু জায়গায় শামের ভূমির বরকত সম্পর্কে আলোচনা এসেছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, যাদের দুর্বল মনে করা হতো, আমি তাদের উত্তরাধিকার দিয়েছি এমন ভূমির, যার পূর্ব ও পশ্চিমে আমি বরকত রেখেছি। সুরা আরাফ: ১৩৭

আরেক আয়াতে বলা হয়েছে পরম পবিত্র তিনি, যিনি তার বান্দাকে মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত রাতের বেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন। এর চারপাশে আমি বরকত রেখেছি। (সুরা বনি ইসরাঈল: ১) মোফাসসিরগণ একমত হয়েছেন যে, এই বরকতময় ভূমি বলতে শামকেই বোঝানো হয়েছে।

হাশরের ময়দান হবে শামে

ইমাম কুরতুবি, ইবনে কাসির, এবং ইবনে হাজার (রহ.) বলেছেন, শাম হলো হাশরের ভূমি। প্রথম হাশর সংঘটিত হয়েছে এখানে ইহুদিদের বহিষ্কারের মাধ্যমে। আর দ্বিতীয়বার এই ভূমিতেই সমগ্র মানবজাতি একত্রিত হবে।

 রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের হাশর হবে শামের মাটিতে। সেখানেই আরোহী, পদাতিক, ও অধঃমুখী তিন দলে বিভক্ত হবে মানুষ।” মুসনাদে আহমদ: ৩৩/২১৪

ফেরেশতাদের ছায়া বিছানো থাকে যে ভূমিতে

রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শামের প্রশংসা করে বলেছেন, শামের জন্য সৌভাগ্য! কারণ ফেরেশতারা তাদের ডানা দিয়ে এই ভূমিকে আবৃত করে রেখেছে। তিরমিজি: ৩৯৫৪

 এক বিশেষ হাদিসে বলা হয়েছে, কিয়ামত পর্যন্ত একটি দল শামে হকের ওপর অটল থাকবে। তাদের কোনো শত্রু কখনো পরাজিত করতে পারবে না। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যখন শামবাসীরা খারাপ হয়ে যাবে, তখন তোমাদের আর কোনো কল্যাণ থাকবে না। তবে আমার উম্মতের একটি দল সবসময় সাহায্যপ্রাপ্ত হবে। তিরমিজি: ২১৯২

শাম হবে নবী ইসা আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অবতরণের স্থান

হজরত ইসা আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়ামতের আগে সিরিয়ার দামেস্ক নগরীর পূর্বদিকে অবতরণ করবেন। সেখানেই তিনি দাজ্জালকে হত্যা করবেন। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন দাজ্জাল ইসা আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখামাত্র গলে যাবে। তারপর তিনি নিজের হাতে তাকে হত্যা করবেন। মুসলিম: ৭১৭০

ফিতনা থেকে নিরাপদ ভূমি সিরিয়া বা শাম

যখন পৃথিবীতে ফিতনা ছড়িয়ে পড়বে, তখন শাম থাকবে শান্ত ও নিরাপদ। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ফিতনার সময়ে শাম হবে ঈমানের ঘাঁটি। কোরআনের আলো এখান থেকেই ছড়াবে। মুসতাদরাকে হাকিম: ৫/৭১২
 
নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উম্মতকে শামে অবস্থানের জন্য অসিয়ত করেছেন। তিনি বলেছেন “যখন ফিতনা ছড়িয়ে পড়বে, তখন শামের ভূমি আঁকড়ে ধরো।” মুসনাদে আহমদ: ৯/১৪৫
 
শুরাইহ ইবনে উবাইদ (রহ.) বলেন, হজরত আলী রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু একবার শামবাসীদের প্রতি অভিশাপ দেয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন, 
 
আমি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, শামে আবদালরা (আল্লাহর বিশেষ ওলি) অবস্থান করেন। তারা ৪০ জন থাকেন। যখন একজন মারা যান, আল্লাহ তার স্থানে আরেকজনকে নিযুক্ত করেন। তাদের বরকতে বৃষ্টি হয় এবং শত্রুর বিরুদ্ধে জয়লাভ হয়। মুসনাদে আহমদ ৮৯৬

মুয়াবিয়া ইবনে কুররা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু বর্ণনা করেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন শাম ফাসাদে জড়িয়ে পড়বে, তখন তোমাদের মধ্যেও কোনো কল্যাণ থাকবে না। আমার উম্মতের একটি দল সর্বদা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে আর কিয়ামত পর্যন্ত কেউ তাদের ক্ষতি করতে পারবে না। তিরমিজি ২১৯২
 
হজরত আবুদ্দারদা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু বর্ণনা করেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মহাযুদ্ধের সময় মুসলিমদের ছাউনি হবে গোতা শহরে, যা দামেস্কের পাশে অবস্থিত। এটি শামের একটি উৎকৃষ্ট স্থান। আবু দাউদ ৪২৯৮
 
মুমিনদের শেষ আশ্রয়স্থল হলে শামে

রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “মুমিনদের বাসভূমি হবে শামের পবিত্র ভূমি।” মুসনাদে আহমদ: ২৮/১৬৫ 

শামের ভূখণ্ড শুধুই একটি ভূমি নয়; এটি বরকতময় এবং আল্লাহতায়ালার বিশেষ রহমতের প্রতীক। কিয়ামতের আগে এই অঞ্চলে সংঘটিত হবে এমন অনেক ঘটনা, যা পৃথিবীর ইতিহাসে অনন্য হয়ে থাকবে। এই ভূমি শুধু নবী-রাসুলদের স্মৃতি নয়, বরং এক মহা বরকতময় ভবিষ্যতের ইঙ্গিতও বহন করে। তাই, এই ভূমির ফজিলত আমাদের জন্য এক বিশেষ বার্তা।

ইমাম মাহদির খেলাফত ও ভূমিধস

উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু বর্ণনা করেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, একজন খলিফার মৃত্যুর পর মতানৈক্য দেখা দেবে। তখন একজন ব্যক্তি (ইমাম মাহদি) মদিনা থেকে মক্কায় আসবেন আর মানুষের চাপের মুখে বাইয়াত গ্রহণ করবেন। তার বিরুদ্ধে শাম থেকে একটি দল পাঠানো হবে, কিন্তু তারা বাইদা নামক স্থানে ভূমিধসে পতিত হবে। মুসলিম ২৮৮২

 
শামের ভূমি ইসলামের ইতিহাসে এবং ভবিষ্যদ্বাণীগুলোর আলোকে এক মহাবরকতময় স্থান হিসেবে উল্লেখিত। এটি শুধু নবী-রাসুলদের স্মৃতিধন্য নয়, বরং কিয়ামতের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলির কেন্দ্রবিন্দু। হাশরের ময়দান থেকে শুরু করে নবী ইসা আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আগমন, দাজ্জালের পরাজয় এবং ফিতনা থেকে নিরাপত্তার বাণী-সবকিছুই শামের বিশেষ মর্যাদার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
 
বর্তমান সময়ে শামের পরিস্থিতি বিবেচনা করলে দেখা যায়, এই ভূমিতে সংঘটিত ঘটনাগুলো ইসলামের ভবিষ্যদ্বাণীগুলোর প্রাসঙ্গিকতাকে তুলে ধরছে। শামের ভূমি শুধু ভৌগোলিক অঞ্চল নয়, বরং তা ঈমানদারদের জন্য শিক্ষা, সতর্কতা এবং আশা জাগ্রত করার এক অনন্য প্রতীক। আমাদের উচিত শামের ভূমি সম্পর্কে আরও জানার চেষ্টা করা, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অসিয়ত অনুসরণ করা এবং এই বরকতময় ভূমির ফজিলত হৃদয়ে ধারণ করা।
 
আল্লাহ যেন আমাদেরকে কিয়ামতের আগেই নিজেদের পরিশুদ্ধির তাওফিক দান করুন। কিয়ামতের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করুন। আমিন।

নবীন নিউজ/জেড

এই সম্পর্কিত আরও খবর

আরও খবর

news image

মহানবী এর রওজা জিয়ারতের নতুন নিয়ম ও সময়সূচি ঘোষণা

news image

চাকরি হচ্ছে না? এই ২ আমলে দ্রুত মিলবে সমাধান

news image

মসজিদের পাশে কবর দিলে কি কবরের আজাব কম হয়?

news image

বাংলাদেশ থেকে এবার কতজন হজে যেতে পারবেন, জানাল মন্ত্রণালয়

news image

বিশ্বের প্রথম মুসলিম দেশ হিসেবে যে ইতিহাস গড়ল মালদ্বীপ

news image

স্বামীর ভালোবাসা ফিরিয়ে আনার কোরআনি আমল

news image

অভাব-অনটন থেকে মুক্তি মিলবে যে দোয়ায়

news image

আল-আজহার মসজিদের ১ হাজার ৮৫ বছর উপলক্ষে ইফতারে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা

news image

একটি পাখির কারণে আফ্রিকার প্রথম মসজিদের স্থান নির্বাচন করা হয়েছিল!

news image

ধর্ষণকারীকে যে শাস্তি দিতে বলেছে ইসলাম

news image

রোজা রেখে আতর-পারফিউম ব্যবহার করা যাবে?

news image

ধর্ষণের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে যা বললেন আজহারী

news image

রোজার মাস মানেই কি ভালো খাবার খাওয়া?

news image

রমজানে রোগীদের জন্য কিছু মাসয়ালা

news image

অজু-গোসলের সময় গলায় পানি গেলে রোজা ভেঙে যাবে?

news image

মসজিদে হারাম ও নববিতে আজ জুমার নামাজ পড়াবেন যারা

news image

ইফতারে ঝটপট সবজি কাটলেট তৈরি করবেন যেভাবে

news image

আলট্রাসনোগ্রাম করলে রোজা ভেঙে যাবে?

news image

ইফতারের পর ধূমপান করলে যেসব বিপদ ঘটে শরীরে

news image

যেসব কারণে রোজার ক্ষতি হয় না

news image

জাকাতের টাকায় ইফতার সামগ্রী দেওয়া যাবে?

news image

ইফতারের আগে করা যায় যেসব আমল

news image

রোজা আদায় না করলে যে শাস্তি

news image

মানুষের সেবা করার সেরা মাস রমজান

news image

‘আমিই জীবন দেই, আমিই মৃত্যু দেই, আর আমার কাছেই সবাইকে ফিরে আসতে হবে’

news image

রমজানে যে ৭ আমল বেশি করতে হবে

news image

রমজান মাসে ফজিলতপূর্ণ যে ৩ আমল করবেন

news image

ইফতারে আরবদের পাতে শোভা পায় যেসব ঐতিহ্যবাহী খাবার

news image

রমজান মাসের গুরুত্ব ও ফজিলত

news image

রমজানে ওমরা করলে আসলেই কি হজের সওয়াব পাওয়া যায়?