বৃহস্পতিবার ১৪ মে ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বঙ্গাব্দ
ধর্ম

কোরআন ও বিজ্ঞানের বয়ানে পাহাড়ের গঠনশৈলী

নবীন নিউজ, ডেস্ক ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ০৯:৪৮ এ.এম

সংগৃহীত ছবি

কোরআনের অসংখ্য মুজিজার মধ্যে অন্যতম একটি বিস্ময় লুকিয়ে রয়েছে দুটি শব্দের শিল্পসম্মত ব্যবহারে : ‘নাসাবা’ স্থাপন করা ও ‘আলক্বা’ নিক্ষেপ করা। যদিও এ দুটি শব্দ একসূত্রে গাঁথা, তবে তাদের অর্থ ও প্রয়োগের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য এক অনন্য সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে। এই শব্দ দুটি বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয়েছে পাহাড়ের সৃষ্টির রহস্য উন্মোচনের জন্য।

কোরআনে বলা হয়েছে : ‘আর পাহাড়ের দিকে তাকাও, কিভাবে সেগুলো স্থাপন করা হয়েছে।’ (সুরা : আল-গাশিয়া, আয়াত : ১৯)।

অন্য আরেক জায়গায় এসেছে : ‘তিনি পৃথিবীতে সুদৃঢ় পাহাড় স্থাপন করেছেন, যাতে পৃথিবী তোমাদের নিয়ে নড়ে না যায়।’ (সুরা : আন-নাহল, আয়াত : ১৫)।

কোরআনের শব্দগুলোর গভীরতা ও আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে তার তুলনা করলে বোঝা যায়, প্রতিটি শব্দ কতটা পরিপূর্ণ অর্থবোধক ও প্রাসঙ্গিক। ভূতত্ত্বের আলোকে, পাহাড়সমূহ গঠন প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত-ভাঁজযুক্ত পাহাড়, বৃহৎ পাথুরে পাহাড় এবং আগ্নেয়গিরি পাহাড়।

এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়, ভাঁজযুক্ত ও বৃহৎ পাথুরে পাহাড়ের সৃষ্টি ঘটে নাসাবা অর্থাৎ স্থাপন করা বা গেঁথে দেওয়ার মাধ্যমে। আর আগ্নেয়গিরি পাহাড়ের গঠন ঘটে আলক্বা অর্থাৎ নিক্ষেপ বা উদগিরণের মাধ্যমে।

উঁচু উঁচু পাহাড় সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা কোরআনে বলেন, ‘তারা কি উটের দিকে লক্ষ্য করে না, কিভাবে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে? এবং আকাশের দিকে, কিভাবে তা ঊর্ধ্বে স্থাপন করা হয়েছে? আর পাহাড়সমূহের দিকে, কিভাবে সেগুলো দৃঢ়ভাবে স্থাপন করা হয়েছে?’ (সুরা : আল-গাশিয়াহ, আয়াত : ১৭-১৯)।

এই আয়াতে সেই পর্বতমালার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, যেগুলো টেকটোনিক প্লেটের (Plate tectonics) সংঘর্ষ কিংবা ফল্ট ব্লকগুলোর (Fault blocks)  চলাচলের কারণে ক্রমেই উঁচু হয়। অর্থাৎ পৃথিবীর অভ্যন্তরে চলমান এই সংঘর্ষ যত দিন চলতে থাকবে, পাহাড় ততই উঁচু হতে থাকবে। অন্যদিকে আগ্নেয়গিরি থেকে সৃষ্ট পর্বতের ক্ষেত্রে দেখা যায়, যখন কোনো আগ্নেয়গিরি অগ্ন্যুৎপাত করে, তখন ভূগর্ভ থেকে উদগিরণ হওয়া লাভা, ছাই ও অন্যান্য উপাদান ভূপৃষ্ঠে জমা হতে থাকে।

এই জমাট বাঁধা উপাদানগুলো ক্রমে এক বিশাল পর্বতের রূপ নেয়। আল্লাহ তাআলা এ সম্পর্কে কোরআনে বলেছেন : ‘তিনি পৃথিবীতে সুদৃঢ় পাহাড় স্থাপন করেছেন, যাতে পৃথিবী তোমাদের নিয়ে নড়ে না যায়।’ (সুরা : আন-নাহল, আয়াত : ১৫)।

উইলিয়াম ক্যাম্পবেল তাঁর গবেষণায় আগ্নেয়গিরি থেকে সৃষ্ট পর্বতমালা সম্পর্কে লিখেছেন : আগ্নেয়গিরি থেকে সৃষ্ট পর্বতের আরেকটি ধরন হলো এমন-যেখানে ভূগর্ভ থেকে লাভা ও ছাই নির্গত হয় এবং এগুলো ভূপৃষ্ঠে জমা হতে হতে এক বিশাল পাহাড়ে পরিণত হয়। (The Quran and the Bible: In the Light of History and Science, p. 172)।

কোরআনের পরিভাষাগুলো এমন সূক্ষ্ম গভীরতা ও নিখুঁতভাবে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব প্রকাশ করে, যা মানুষের কল্পনার গণ্ডিকেও ছাড়িয়ে যায়। কোরআন অবতীর্ণের সময় এই জ্ঞান ছিল সম্পূর্ণ অজানা। এ জ্ঞান মানুষ লাভ করেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির মাধ্যমে। কোরআনের এই বহুমাত্রিক প্রকাশ শুধু তার অলৌকিকত্বের নিদর্শন নয়, বরং এটি ভাষার গভীরতা ও প্রকৃতির সঙ্গে তার সম্পর্কের অতুলনীয় সামঞ্জস্যের অনন্য প্রমাণ, যা মানব চেতনার সীমাকে ছাড়িয়ে গেছে।

আরেকটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব, যা কোরআন বহু আগেই প্রকাশ করেছে, তাহলো পাহাড়গুলোকে কখনো আওতাদ বা কীলকরূপে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন : ‘আমি কি পৃথিবীকে শয্যারূপে তৈরি করিনি? এবং পাহাড়কে (ভূমিতে প্রোথিত) কীলকরূপে স্থাপন করিনি?’ (সুরা : আন-নাবা, আয়াত : ৬-৭)।

কোরআনের আরেক স্থানে পাহাড়গুলোকে রাসিয়াহ বা সুদৃঢ়ভাবে স্থাপিত বলে বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন : ‘আর আমি এতে সুউচ্চ ও দৃঢ় পর্বতমালা স্থাপন করেছি এবং তোমাদের জন্য তৃষ্ণা নিবারণকারী সুপেয় পানি দিয়েছি।’ (সুরা : আল-মুরসালাত, আয়াত : ২৭)।

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন : ‘তিনিই পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছেন এবং তাতে দৃঢ়ভাবে পাহাড় ও নদী সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা : আর-রাদ, আয়াত : ৩)

এই বর্ণনাগুলো পাহাড়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের দিকে ইঙ্গিত করে। উদাহরণস্বরূপ একটি জাহাজ যখন পানির ওপর ভাসে, তার ভারসাম্য রক্ষার জন্য নিচের অংশটি পানির গভীরে প্রোথিত থাকে। তদ্রূপ পাহাড়গুলোরও এমন ভিত্তি রয়েছে, যা মাটির গভীরে প্রোথিত হয়ে পৃথিবীকে ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা প্রদান করে।

আধুনিক বিজ্ঞান আজ এমন এক অভাবনীয় তত্ত্ব উদঘাটন করেছে, যা কোরআনের বিস্ময়কর বর্ণনার সঙ্গে অভূতপূর্বভাবে মিলে যায়। পাহাড় শুধু ভূমির ভূদৃশ্যকে নান্দনিক করে তোলে না, বরং তা পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষায় একটি অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। পাহাড়গুলো মাটির গভীরে এমনভাবে প্রোথিত, যেন সেগুলো শক্ত খুঁটির মতো পৃথিবীকে দৃঢ়ভাবে ধরে রেখেছে।

খ্যাতনামা ভূতত্ত্ববিদ সাইমন ল্যাম্ব তাঁর গবেষণায় লিখেছেন : এটি এমন এক বিস্ময়কর আবিষ্কার যে পাহাড়গুলো মাটির গভীরে শিকড়ের মতো প্রোথিত, ঊনবিংশ শতাব্দীর ভূতত্ত্বের অন্যতম বড় মাইলফলক ছিল।
(Violent Earth, p. 46)। 

পাহাড়ের শিকড় সম্পর্কে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব ঊনবিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী জর্জ এরি আবিষ্কার করেন। তিনি লিখেছেন : পাহাড়ের শিকড় পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠে ভারসাম্য রক্ষা করতে সহায়তা করে। এর শিকড়গুলো ভূত্বকের গভীরে ম্যান্টলের (Mantle) স্তরে প্রবেশ করে এবং এর উচ্চতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। এই প্রক্রিয়াকে ভূবিজ্ঞানীরা ‘আইসোস্ট্যাসি’ বলে অভিহিত করেছেন।

কোরআনে এই তত্ত্ব বা হাকিকত বহু শতাব্দী আগেই সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন : ‘আমি কি পৃথিবীকে শয্যারূপে তৈরি করিনি? এবং পাহাড়গুলোকে কীলকরূপে স্থাপন করিনি?’ (সুরা : আন-নাবা, আয়াত : ৬-৭)।

এই বৈজ্ঞানিক তত্ত্বগুলো কোরআনের অলৌকিকতার উজ্জ্বল প্রমাণ, যা মানব মনে বিস্ময় জাগায় এবং আল্লাহর সৃষ্টির গভীরতার প্রতি এক অনন্য শ্রদ্ধার জন্ম দেয়। উল্লিখিত বৈজ্ঞানিক তত্ত্বগুলো সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে কোরআন সম্পর্কে আলী রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু-এর উক্তি কতটা সত্য ও গভীর। তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা তাঁর পথকে তোমাদের জন্য মনোনীত করেছেন এবং তাঁর সুস্পষ্ট বিধান এবং লুক্কায়িত প্রজ্ঞার মাধ্যমে তাঁর উপদেশগুলোকে সুস্পষ্ট করেছেন। তাঁর বিস্ময়কর বিষয় কখনো শেষ হবে না এবং তাঁর আশ্চর্যতাগুলো কখনো নিঃশেষ হবে না।’ (নাহজুল বালাগা, পৃষ্ঠা-২১২)।

এই বাণীর মর্মার্থ আজ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের আলোতে আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। কোরআনের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি উপমা এবং প্রতিটি ধারণা এক অপার রহস্য ও জ্ঞানের ভাণ্ডার, যা যুগে যুগে মানুষকে বিস্মিত করেছে এবং করবে। এর অভ্যন্তরীণ প্রজ্ঞা ও বাহ্যিক নির্দেশনা এমনভাবে একে অপরের সঙ্গে সংমিশ্রিত যে তা আল্লাহর ঐশী জ্ঞানের এক মহিমাময় প্রকাশ হয়ে মানুষের হৃদয়ে অনুপ্রেরণা জাগায়। মোটকথা, এই অসাধারণ তত্ত্ব, যা আজকের বিজ্ঞান আবিষ্কার করেছে, তা কোরআনে বহু শতাব্দী আগে থেকেই সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে।

নবীন নিউজ/এফ 

এই সম্পর্কিত আরও খবর

আরও খবর

news image

মহানবী এর রওজা জিয়ারতের নতুন নিয়ম ও সময়সূচি ঘোষণা

news image

চাকরি হচ্ছে না? এই ২ আমলে দ্রুত মিলবে সমাধান

news image

মসজিদের পাশে কবর দিলে কি কবরের আজাব কম হয়?

news image

বাংলাদেশ থেকে এবার কতজন হজে যেতে পারবেন, জানাল মন্ত্রণালয়

news image

বিশ্বের প্রথম মুসলিম দেশ হিসেবে যে ইতিহাস গড়ল মালদ্বীপ

news image

স্বামীর ভালোবাসা ফিরিয়ে আনার কোরআনি আমল

news image

অভাব-অনটন থেকে মুক্তি মিলবে যে দোয়ায়

news image

আল-আজহার মসজিদের ১ হাজার ৮৫ বছর উপলক্ষে ইফতারে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা

news image

একটি পাখির কারণে আফ্রিকার প্রথম মসজিদের স্থান নির্বাচন করা হয়েছিল!

news image

ধর্ষণকারীকে যে শাস্তি দিতে বলেছে ইসলাম

news image

রোজা রেখে আতর-পারফিউম ব্যবহার করা যাবে?

news image

ধর্ষণের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে যা বললেন আজহারী

news image

রোজার মাস মানেই কি ভালো খাবার খাওয়া?

news image

রমজানে রোগীদের জন্য কিছু মাসয়ালা

news image

অজু-গোসলের সময় গলায় পানি গেলে রোজা ভেঙে যাবে?

news image

মসজিদে হারাম ও নববিতে আজ জুমার নামাজ পড়াবেন যারা

news image

ইফতারে ঝটপট সবজি কাটলেট তৈরি করবেন যেভাবে

news image

আলট্রাসনোগ্রাম করলে রোজা ভেঙে যাবে?

news image

ইফতারের পর ধূমপান করলে যেসব বিপদ ঘটে শরীরে

news image

যেসব কারণে রোজার ক্ষতি হয় না

news image

জাকাতের টাকায় ইফতার সামগ্রী দেওয়া যাবে?

news image

ইফতারের আগে করা যায় যেসব আমল

news image

রোজা আদায় না করলে যে শাস্তি

news image

মানুষের সেবা করার সেরা মাস রমজান

news image

‘আমিই জীবন দেই, আমিই মৃত্যু দেই, আর আমার কাছেই সবাইকে ফিরে আসতে হবে’

news image

রমজানে যে ৭ আমল বেশি করতে হবে

news image

রমজান মাসে ফজিলতপূর্ণ যে ৩ আমল করবেন

news image

ইফতারে আরবদের পাতে শোভা পায় যেসব ঐতিহ্যবাহী খাবার

news image

রমজান মাসের গুরুত্ব ও ফজিলত

news image

রমজানে ওমরা করলে আসলেই কি হজের সওয়াব পাওয়া যায়?