শক্রবার ০৫ জুন ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বঙ্গাব্দ
সারাদেশ

বন্যায় প্লাবিত বসতভিটা, দিশাহারা ৮৬৫৯ টি পরিবার

নবীন নিউজ, ডেস্ক ২৯ অক্টোবার ২০২৪ ০৪:১১ পি.এম

সংগৃহীত ছবি

ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার দক্ষিণ জগতপুর গ্রামের বাসিন্দা সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক খোকন মিয়া। গত ২০ আগস্টের সর্বনাশী বন্যায় প্লাবিত হয় তার বসতভিটা। পরে তিন ছেলে আর স্ত্রীকে নিয়ে ঠাঁই নেন পাশের একটি আশ্রয়কেন্দ্রে। পানি নেমে গেলে ৯ দিন পর বাড়ি এসে দেখেন কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। নিরূপায় হয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সেচ স্কিমের ছোট্ট একটি ঘরে স্ত্রী—সন্তান নিয়ে থাকছেন তিনি।

বন্যায় বিধ্বস্ত বসতভিটায় বসে আছেন খোকন। পাশের ছোট্ট স্কিম ঘরে রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছেন স্ত্রী বিলকিস বেগম। কথা হলে খোকন মিয়া বলেন, ‘সবকিছু দুঃস্বপ্নের মতো লাগছে।

এক বন্যা আমাকে পুরো নিঃস্ব করে দিয়ে গেছে। কোনো কিছুই রক্ষা করতে পারিনি। ছোট তিন সন্তান আর স্ত্রীকে নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছিলাম। এক মাস হয়ে গেছে কোনো কামকাজ নাই। কী করে ঘর তুলব মাথায় আসছে না। বন্যার এক মাস হয়ে গেল, অথচ এখন পর্যন্ত আমাদের পুনর্বাসনে সরকারের কোনো উদ্যোগ দেখিনি।’

ফেনীতে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় ঘর-বাড়ি হারিয়ে খোকন মিয়ার মতো সরকারের কাছে সাহায্যের আবেদন করেছেন ৮৬৫৯ পরিবার। এদের মাঝে সম্পূর্ণ ঘর-বাড়ি হারিয়েছে ১৬৬৭ পরিবার। তারা নিজ নিজ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে ত্রাণ ও পূর্ণবাসন শাখায় সাহায্যে আবেদন করেন। আবেদনের এক মাস ও বন্যার দুই মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো সরকারিভাবে কোনো সহায়তা পাননি কেউ।

বেসরকারিভাবে বিভিন্ন সংগঠন সামান্য সহযোগিতা পেলেও ১৬৬৭ পরিবার এখনো অন্যের আশ্রয়ে ও স্থানীয় বিভিন্ন অব্যবহ্ত স্থাপনায় অস্থায়ী ঘর তৈরি করে থাকছেন।

জেলা ত্রাণ ও পূর্ণবাসন শাখায় সূত্র মতে, ফেনী সদর উপজেলায় সম্পূর্ণ ঘর বাড়ি হারিয়ে ৬৭৫ জন ও আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩২০৬ জন, পরশুরামে আংশিক ৩৩৩ জন ও সম্পূর্ণ ৩৫০ জন, ছাগলনাইয়ায় সম্পূর্ণ ২৯৩ জন, আংশিক ৩১৩ জন , দাগনভূঞা সম্পূর্ণ ৮৫ ও আংশিক ৯৮২ জন , সোনাগাজীতে সম্পূর্ণ ৩৭ জন ও আংশিক ৭৪১ জন, ফুলগাজিতে ২৯৫ জন সম্পূর্ণ ও ১৩৪৯ পরিবার আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পূর্ণবাসনের জন্য সাহায্যের আবেদন করেন।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. মাহবুব আলম জানান, রবিবার (২০ অক্টোবর) সরকারিভাবে ৪০০ বান্ডেল ঢেউটিন পেয়েছেন। প্রতি বান্ডেল ঢেউটিনের সাথে তিন হাজার টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও এখনো পাননি। শীঘ্রই পাবেন বলেও আশা প্রকাশ করেন।

তিনি আরও জানান, প্রাপ্ত ঢেউটিন দিয়ে সর্বোচ্চ ১৫০ পরিবারকে সাহায্য করা যাবে। কারণ সম্পুর্ন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে তিন বান্ডেল ও আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত পবিরারকে দুই বান্ডেল ঢেউটিন ও সাথে প্রতি বান্ডেল ঢেউটিনের সাথে তিন হাজার টাকা দেওয়া হবে।

গত ১১ সেপ্টেম্বর জেলায় বন্যার ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ প্রকাশ করেছে জেলা প্রশাসন। প্রাপ্ত তথ্যমতে, বন্যায় জেলায় বিভিন্ন খাতে আনুমানিক ক্ষতি হয়েছে ২ হাজার ৮৫৯ কোটি ৫৮ লাখ ৯১ হাজার ৩১৩ টাকা। এর মধ্যে ৬৪ হাজার ৪১৫টি ঘরবাড়িতে মোট ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ৫৩৩ কোটি ৮৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা। ৫৪টি মসজিদ সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এতে মোট ৬ কোটি ৯১ লাখ ৬০ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ১৪৪টি মন্দিরে ৪৫ লাখ ২০ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের ক্ষতি হয়েছে ৩ কোটি ৯৭ লাখ ১৫ হাজার ৫৯৮ টাকার। সড়ক, সেতু, কালভার্ট, নদী ও বাঁধের ক্ষতি হয়েছে ৯২৮ কোটি ৯৯ লাখ ৩২ হাজার ৯৩৮ টাকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ৩৯ কোটি ২ লাখ ৭৩ হাজার ৭৯৮ টাকার।

জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, বন্যায় ফেনীতে ৮ হাজার ৯৫টি কাঁচাঘর, ২৫০টি আধাপাকা ঘর সম্পূর্ণ ধ্বসে যায়। এতে আনুমানিক ক্ষতি হয়েছে ১৬৩ কোটি ১১ লাখ ৭০ হাজার টাকা। ৫৩ হাজার ৪৩৩টি কাঁচাঘর এবং ২ হাজার ৬৩২টি আধাপাকা ঘরের আংশিক ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ ৩৭০ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। সবমিলিয়ে ৬৪ হাজার ৪১৫টি ঘরবাড়িতে মোট ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ৫৩৩ কোটি ৮৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা।

জেলা প্রশাসনের ত্রাণ ও পুনর্বাসন শাখা সূত্র জানায়, ইউএনডিপি ১০ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩ হাজার পরিবারকে ঘর সংস্কারের জন্য ৩০ হাজার টাকা করে সহায়তা করছেন। একইভাবে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইপসা ২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, রিক ৮৯ লাখ টাকা এবং মাস্তুল ফাউন্ডেশন ১১ লাখ টাকা বসতঘর সংস্কারে সহায়তা দিচ্ছে। জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে সংস্কার কাজগুলো বাস্তবায়ন করা হবে।

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে ব্যক্তিগত উদ্যোগ এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এগিয়ে আসতে দেখা গেছে। ঘুরে দাঁড়াবে ফেনী শীর্ষক একটি সংগঠন এ পর্যন্ত ১৩টি পরিবারকে নতুন ঘর এবং ক্ষতিগ্রস্ত ঘর সংস্কার করে দিয়েছে বলে জানিয়েছেন সংগঠক শরীফুল ইসলাম অপু। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১ ব্যাচের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে ৩৮ পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যাচ সদস্য শামছুউদ্দৌলা। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা জানান, এমন সহায়তার তালিকায় আরো অনেকে রয়েছে।

সোনাগাজীর আবু তাহের বলেন, ‘পানির স্রোত সবকিছু লন্ডভন্ড করে দিয়ে গেছে। জীবন নিয়ে কোনো রকমে আশ্রয়কেন্দে্র যেতে পেরেছি। আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে বাড়ি এসেছি ঠিকই, ঘরে এখনো ঢুকতে পারিনি। পরিবার নিয়ে এক চাচাতো ভাইয়ের বাড়ির ছাদে বসবাস করছি।’

শামসুন্নাহার নামে পঞ্চাশোর্ধ্ব এক নারী বলেন, ‘ঘরবাড়ি সব বন্যায় নিয়ে গেছে। ঘর মেরামত করার সামর্থ্যও নেই। সরকারিভাবে যদি আর্থিক সহযোগিতা পাই, তাহলে ঘর মেরামত করতে পারব। না হয় ভাঙা ঘরেই থাকতে হবে।’

পরশুরাম উপজেলার চিথলিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ জঙ্গলঘোনা গ্রামের ফখরের নেছা (৫০)। পানির তীব্র স্রোতে মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে গত এক মাস একটি সেতুর ওপর ঝুপড়ি তৈরি করে স্বামী—সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন তিনি।

ফখরের নেছা বলেন, ‘সেদিন রাতে কোনোমতে সিলোনিয়া ব্রিজের ওপর উঠে জীবন বাঁচিয়েছি। ঘরের সব আসবাব শেষ হয়ে গেছে। খোলা আকাশের নিচে রান্না করে খেয়ে না—খেয়ে বেঁচে আছি, কোনো সাহায্য পাইনি।’

ফুলগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানিয়া ভূঁইয়া বলেন, বন্যায় আবাসনসহ আরও একাধিক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করছি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন এনজিও ও সংগঠন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে আর্থিক অনুদান দিয়েছে।

পরশুরামের ইউএনও আফরোজা হাবিব শাপলা বলেন, ‘পুনর্বাসনপ্রত্যাশীরা আবেদন করছেন, আমরা তালিকা প্রণয়ন করছি। তবে সরকারিভাবে পুনর্বাসনের এখনো কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।’

ফেনীর জেলা প্রশাসক মুছাম্মৎ শাহীনা আক্তার বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সহায়তায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ২০ হাজার বান্ডেল টিন ও নগদ ৬ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। এছাড়া বেসরকারিভাবে যেসব প্রতিষ্ঠান এবং সংগঠন পুনর্বাসনে সহায়তায় এগিয়ে এসেছে তাদের কাজগুলো প্রশাসনের পক্ষ থেকে সমন্বয় করা হচ্ছে। গৃহনির্মাণের জন্য সরকারি বরাদ্দ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা কাজ শুরু করে দেব। তবে সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান টিনসহ বিভিন্ন উপকরণ বিতরণ ও গৃহনির্মাণে কাজ করছে। ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক অনুদান দিচ্ছে।’

নবীন নিউজ/জেড

এই সম্পর্কিত আরও খবর

আরও খবর

news image

কেরানীগঞ্জে মা-মেয়েকে হত্যার পর ২১ দিন লাশের সঙ্গে বসবাস

news image

এবার যারা ভোটকেন্দ্রে যাবেন, তারা মরার প্রস্তুতি নিয়ে যাবেন : জেলা প্রশাসক

news image

টঙ্গীতে হঠাৎ খিঁচুনি উঠে অসুস্থ অর্ধশতাধিক শ্রমিক

news image

আপাতত কমছে না শীতের প্রকোপ

news image

ঋণের মামলা থেকে বাঁচতে আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন সবুর

news image

হাদির ছবি আঁকা হেলমেট পরে বিশ্ব রেকর্ড গড়তে যাচ্ছেন আশিক চৌধরী

news image

ওসমান হাদির ওপর হামলাকারীরা ভারতে প্রবেশ করেছে: জুলকারনাইন সায়ের

news image

মিরপুর চিড়িয়াখানার খাঁচা থেকে বেরিয়ে গেছে সিংহ

news image

চকবাজারের আবাসিক ভবনে আগুন

news image

মধ্যরাতে ভূমিকম্পে কাঁপল দেশ

news image

বিছানায় ২ সন্তানের গলাকাটা মরদেহ, পাশেই রশিতে মায়ের ঝুলন্ত লাশ

news image

চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষার আন্দোলন করতে গিয়ে নিজেরাই বিভক্ত!

news image

মেট্রোরেলে গাঁজা পরিবহন, বাবা-মেয়ে আটক

news image

কুমিল্লায় জামায়াত নেতার গাড়িতে অগ্নিসংযোগ

news image

অভিনেত্রী মেহজাবীনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

news image

যুবলীগের নেতা নিখোঁজ, ছেলের মরদেহ নদীর থেকে উদ্ধার

news image

ফ্ল্যাটে স্ত্রীর গলাকাটা মরদেহ, পাশে গুরুতর আহত স্বামী

news image

বিএনপি কর্মীর মাথা ফাটালেন জামায়াত নেতারা

news image

ফতুল্লায় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার ৩ সংবাদকর্মী

news image

বিমানবন্দরে আটকে দেওয়া হয়েছে সোহেল তাজকে

news image

কর্মীর হাতে পিটুনি খেয়ে বিএনপি নেতার আত্মহত্যা

news image

ইবনে সিনা হাসপাতালে হামলা-ভাঙচুর

news image

আসন পুনর্বহালের দাবিতে নির্বাচন ভবন ঘেরাও

news image

বদলি হলেই নতুন বিয়ে! সরকারি কর্মকর্তার ১৭ স্ত্রীর অভিযোগে তোলপাড়

news image

দাওয়াত না দেওয়ায় মাদ্রাসার সব খাবার খেয়ে ও নষ্ট করে গেলেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা

news image

দালাল ও দুর্নীতিবাজদের অভয়ারণ্য দৌলতপুর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস

news image

মৃত্যু নিশ্চিত ভেবে স্কুলছাত্রীকে রেখে পালিয়ে যায় ঘাতক

news image

বিএনপির কাউন্সিলে ভোট গণনার সময় ব্যালট বাক্স ছিনতাই

news image

বিদেশে বসে আদালতে ‘সশরীরে’ হাজিরা দেন আসামি

news image

শ্বাসরোধে হত্যার পর উর্মীর মরদেহ খালে ফেলে দেন মা-বাবা