সোমবার ২৫ মে ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বঙ্গাব্দ
ধর্ম

আদর্শ মুসলিম শাসক উমর ইবনে আব্দুল আজিজ রাহিমাহুল্লাহ

নবীন নিউজ, ডেস্ক ২১ জানু ২০২৫ ০৮:৪৬ এ.এম

সংগৃহীত ছবি

উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রহ.) উমাইয়া খেলাফতের অষ্টম খলিফা। সত্যনিষ্ঠা, খোদাভীরুতা ও ন্যায়-ইনসাফের কারণে মুসলিম উম্মাহ তাঁকে খুলাফায়ে রাশিদিনের মধ্যে গণ্য করে। তাঁকে পঞ্চম বা ষষ্ঠ খলিফায়ে রাশেদও বলা হয়। এ ছাড়া তাঁকে ‘দ্বিতীয় উমর’ বলেও স্মরণ করা হয়।

শৈশব থেকে মদিনা নগরীতে মহান ব্যক্তিদের সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠায় দৃঢ়তা ও শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব ছিল উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রহ.)-এর প্রধান গুণাবলি।
 
মদিনার গভর্নর নিযুক্তির মাধ্যমে শাসনকার্যের সূচনা

৮৭ হিজরিতে খলিফা আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান উমর ইবনে আব্দুল আজিজকে মদিনার গভর্নর নিযুক্ত করেন। ৯১ হিজরিতে তিনি তায়েফসহ পুরো হেজাজের গভর্নর হন। গভর্নর নিযুক্তির পর প্রথম দিনই তিনি মদিনার বিজ্ঞ আলেমদের ডেকে বললেন : ‘আপনারা আমাকে সৎ পথে চলতে সহযোগিতা করবেন, আমি আপনাদের পরামর্শ ছাড়া কোনো কাজ করব না।

আমার অধীন কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর থেকেও কোনো জুলুমের খবর পেলে আমাকে অবশ্যই জানাবেন।’ ফলে সবাই তাঁকে স্বাগত জানান ও সন্তুষ্টচিত্তে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
(সিয়ারু আলামিন নুবালা ৫/১১৮)

মুসলিম উম্মাহর খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ

৯৯ হিজরিতে সুলাইমান ইবনে আব্দুল মালিকের ইন্তেকালের পর উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রহ.) উম্মাহর খলিফা নিযুক্ত হন। খলিফার দায়িত্ব গ্রহণের আগে তাঁর চলাফেরা ও বেশভূষায় ছিল একজন শৌখিন যুবকের ছাপ।

আতরের সুঘ্রাণ পেলেই মানুষ বুঝতে পারত এ রাস্তা দিয়ে উমর ইবনে আব্দুল আজিজ গিয়েছেন। তাঁর পোশাক-আশাক ও ব্যবহার্য সামগ্রীর মূল্য ছিল আকাশছোঁয়া। কিন্তু সেই উমর খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর চলাফেরায় আমূল পরিবর্তন চলে এলো। আগের জৌলুস ভরা জীবন পরিত্যাগ করে সরল ও সাধারণ জীবন গ্রহণ করলেন।
(আখবারু উমর ইবনে আব্দুল আজিজ, আবু বকর আজুরি পৃ: ৫৫)

খেলাফত গ্রহণের পর সর্বপ্রথম ভাষণেই তিনি বলেন, ‘হে লোকসকল! আমি কোনো আইন প্রণেতা নই, বরং আমি শরিয়তের আইন বাস্তবায়নকারী।

আমি নতুন কিছু আবিষ্কার করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত হইনি, বরং রাসুলুল্লাহ (সা.) ও খুলাফায়ে রাশিদিনের সুন্নাহের অনুসরণকারী। তোমরা যদি আমাকে মেনে নাও তাহলে আমি তোমাদের শাসক, নচেৎ আমি তোমাদের শাসক নই।’ ভাষণ শেষে নামার পর আরোহণের জন্য রাজকীয় বাহন আনা হলে তিনি বললেন : ‘না, আমার সাধারণ বাহনই যথেষ্ট, তা আন।’
(সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৫/১২৬)

শাসনব্যবস্থার বিরল বৈশিষ্ট্য ও কার্যাবলি

দায়িত্ব গ্রহণের পর খেলাফতব্যবস্থার সংস্কারে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। সুশাসন প্রতিষ্ঠা, মজলিসে শুরা বা উপদেষ্টা পরিষদ গঠন, অত্যাচার-নিপীড়নমূলক সব নীতিমালা পরিহার, জনসাধারণের মধ্যে ইলমের প্রচার-প্রসার ও হাদিস সংকলনের সূচনাসহ অনেক কল্যাণমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তিনি।

উমরের আড়াই বছরের সংক্ষিপ্ত খেলাফতকালে এমনই প্রাচুর্য হয়েছে যে মানুষ দান করার জন্য মাল বোঝাই করে দরিদ্রদের খুঁজত, কিন্তু কোনো দরিদ্র খুঁজে না পেয়ে সেগুলো নিয়ে ঘরে ফিরে আসত। আলেমদের মধ্যে যারা দ্বিনি শিক্ষাকার্যক্রমের কারণে আয়-রোজগারের পেছনে সময় দিতে পারতেন না, তিনি তাঁদের জন্য কোষাগার থেকে ভাতা চালু করেন।

(সিরাতে উমর বিন আব্দুল আজিজ, ইবনে আব্দুল হাকাম পৃ: ১১০, ১৪১)

তিনি তাঁর মহান পূর্বসূরি খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর ন্যায় মানুষের দুঃখ-দুর্দশার খোঁজ নিতে ছদ্মবেশে জনপদে বের হতেন, মানুষের সমস্যার সমাধা করতেন, অত্যাচারিত ব্যক্তির পাশে দাঁড়াতেন। (প্রাগুক্ত, পৃ: ১১১, ১১৫)

উমর ইবনে আব্দুল আজিজের স্ত্রী ফাতেমা বলেন : একদা আমি তাঁকে দেখলাম জায়নামাজে বসে অঝোরে কাঁদছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে? তিনি বললেন : ফাতেমা! আমি মুহাম্মাদ (সা.)-এর উম্মতের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছি, তাই আমি ক্ষুধার্ত দরিদ্রদের কথা ভাবছি, অসুস্থ, বস্ত্রহীন, দূরদেশে শত্রুদের হাতে বন্দি, শোষিত, অশীতিপর বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, প্রত্যন্ত অঞ্চলের অভাবগ্রস্ত পরিবারের কথা ভাবছি। আমাকে আমার রব হাশরের দিন এদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করবেন এবং তাদের পক্ষে খোদ মুহাম্মাদ (সা.) দাঁড়াবেন। এ কথা ভেবে ভয়ে কাঁদছি যে সেদিন আমার কী অবস্থা হবে।

(সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৫/১৩২)

আমর ইবনে মুহাজির বলেন : উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রহ.) যখন সরকারি কাজে ব্যস্ত থাকতেন, তখন সরকারি বাতি ব্যবহার করতেন, কিন্তু যখন সরকারি কাজ শেষ হতো তা নিভিয়ে নিজ মালিকানাধীন বাতি জ্বালাতেন। (প্রাগুক্ত : ৫/১৩৬)

অনাড়ম্বর জীবন ও খোদাভীরুতার কিছু দৃষ্টান্ত

খলিফা হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও সার্বিক জীবনযাপনে তাঁর মতো সাদাসিধা অনাড়ম্বর খোদাভীরু শাসক সত্যিই ইতিহাসের পাতায় বিরল। মাইমুন (রহ.) বলেন, আমি উমর ইবনে আব্দুল আজিজের কাছে ছয় মাস অবস্থান করেছি, আমি তাঁকে একটি জামার বেশি ব্যবহার করতে দেখিনি, যা প্রতি জুমার দিন ধুয়ে শুকানোর পর আবার গায়ে দিতেন। একদা জুমায় আসতে দেরির কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন : ‘জামাটি ধুয়ে দিয়েছিলাম, তা শুকাতে দেরি হয়েছিল।’

(সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৫/১৩২)

একদা উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রহ.) অসুস্থ হলে মাসলামা (রহ.) দেখতে যান। তখন তাঁর জামা ময়লা দেখতে পেয়ে স্ত্রী ফাতেমা, যিনি মাসলামার বোন, তাঁকে জামা ময়লা কেন জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, কী করব? তাঁর এ ছাড়া কোনো জামা নেই, এটি ধুয়ে দিলে জামা ছাড়াই থাকতে হবে। (সিরাতে উমর, ইবনে আব্দুল হাকাম : পৃ: ৪৮)

খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর ঘরে সর্বদা অভাব-অনটন লেগেই থাকত। একবার তিনি ঘরে এসে দেখলেন, তাঁর মেয়েরা কথা বলার সময় মুখে হাত চাপা দিচ্ছে। তিনি বললেন, কী ব্যাপার? তারা বলল, আজ ঘরে কোনো তরকারি ছিল না, আমরা পেঁয়াজ দিয়ে রুটি খেয়েছি, আপনার কষ্ট হবে তাই আমরা মুখে হাত চেপে রেখেছি। এতদশ্রবণে তাঁর দুই চোখ অশ্রুসজল হলো। তিনি বললেন, ‘তোমরা কি চাও, তোমরা বিভিন্ন মুখরোচক খাবার খাবে, আর তোমাদের বাবা জাহান্নামের আগুনে জ্বলবে!’ এরপর তাঁরা সবাই কাঁদতে লাগলেন। (প্রাগুক্ত : পৃ: ৫৪)

একবার তাঁর এক কন্যা কানের দুল বানিয়ে দেওয়ার আবেদন করে কাউকে পাঠালে তিনি কন্যার কাছে দুটি জ্বলন্ত অঙ্গার পাঠিয়ে বললেন : ‘যদি তুমি এ দুটি তোমার কানে পরতে পার, তাহলে আমি তোমাকে কানের দুল বানিয়ে দেব।’ (প্রাগুক্ত, পৃ: ১৩৮)

স্ত্রী ফাতেমা বলেন : উমর খুব বেশি নফল পড়তেন না, নফল রোজা রাখতেন না। কিন্তু আল্লাহর কসম, আমি তাঁর মতো অধিক আল্লাহভীরু কাউকে দেখিনি। বিছানায় শুয়ে আল্লাহর কোনো নির্দেশ স্মরণ হলে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতেন এবং বলতেন : ‘হায়! আমার আর এই খেলাফতের দায়িত্বের মধ্যে যদি পূর্ব-পশ্চিমের দূরত্ব হতো।’ আল্লাহর কসম, খেলাফত গ্রহণের পর থেকে আমি তাঁকে কখনো হাসতে দেখিনি। (প্রাগুক্ত, পৃ: ৪৭)

তাঁর ব্যাপারে তাঁর ছেলেকে জিজ্ঞেস করা হলো যে খেলাফত গ্রহণের সময় তিনি কী পরিমাণ সম্পদের মালিক ছিলেন? তিনি বললেন, ৫০ হাজার দিনার (স্বর্ণ মুদ্রা)। এরপর জিজ্ঞেস করা হলো, তাঁর মৃত্যুর সময় কী পরিমাণ সম্পদের মালিক ছিলেন? বলা হলো ২০০ দিনার।

(সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৫/১৩৪)

১০১ হিজরি সনের ২০ রজব মুসলিম উম্মাহর এই মহান খলিফা মৃত্যুবরণ করেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ৩৯ বছর। তাঁর শাসনকাল ছিল মাত্র দুই বছর পাঁচ মাস। মুসলিম উম্মাহ আজও সহস্রাধিক বছর যাবৎ আরেকজন উমর ইবনে আব্দুল আজিজের অপেক্ষায় আছে। আসবে কী সেই প্রতীক্ষিত উমর!

নবীন নি উজ/এফ

এই সম্পর্কিত আরও খবর

আরও খবর

news image

মহানবী এর রওজা জিয়ারতের নতুন নিয়ম ও সময়সূচি ঘোষণা

news image

চাকরি হচ্ছে না? এই ২ আমলে দ্রুত মিলবে সমাধান

news image

মসজিদের পাশে কবর দিলে কি কবরের আজাব কম হয়?

news image

বাংলাদেশ থেকে এবার কতজন হজে যেতে পারবেন, জানাল মন্ত্রণালয়

news image

বিশ্বের প্রথম মুসলিম দেশ হিসেবে যে ইতিহাস গড়ল মালদ্বীপ

news image

স্বামীর ভালোবাসা ফিরিয়ে আনার কোরআনি আমল

news image

অভাব-অনটন থেকে মুক্তি মিলবে যে দোয়ায়

news image

আল-আজহার মসজিদের ১ হাজার ৮৫ বছর উপলক্ষে ইফতারে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা

news image

একটি পাখির কারণে আফ্রিকার প্রথম মসজিদের স্থান নির্বাচন করা হয়েছিল!

news image

ধর্ষণকারীকে যে শাস্তি দিতে বলেছে ইসলাম

news image

রোজা রেখে আতর-পারফিউম ব্যবহার করা যাবে?

news image

ধর্ষণের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে যা বললেন আজহারী

news image

রোজার মাস মানেই কি ভালো খাবার খাওয়া?

news image

রমজানে রোগীদের জন্য কিছু মাসয়ালা

news image

অজু-গোসলের সময় গলায় পানি গেলে রোজা ভেঙে যাবে?

news image

মসজিদে হারাম ও নববিতে আজ জুমার নামাজ পড়াবেন যারা

news image

ইফতারে ঝটপট সবজি কাটলেট তৈরি করবেন যেভাবে

news image

আলট্রাসনোগ্রাম করলে রোজা ভেঙে যাবে?

news image

ইফতারের পর ধূমপান করলে যেসব বিপদ ঘটে শরীরে

news image

যেসব কারণে রোজার ক্ষতি হয় না

news image

জাকাতের টাকায় ইফতার সামগ্রী দেওয়া যাবে?

news image

ইফতারের আগে করা যায় যেসব আমল

news image

রোজা আদায় না করলে যে শাস্তি

news image

মানুষের সেবা করার সেরা মাস রমজান

news image

‘আমিই জীবন দেই, আমিই মৃত্যু দেই, আর আমার কাছেই সবাইকে ফিরে আসতে হবে’

news image

রমজানে যে ৭ আমল বেশি করতে হবে

news image

রমজান মাসে ফজিলতপূর্ণ যে ৩ আমল করবেন

news image

ইফতারে আরবদের পাতে শোভা পায় যেসব ঐতিহ্যবাহী খাবার

news image

রমজান মাসের গুরুত্ব ও ফজিলত

news image

রমজানে ওমরা করলে আসলেই কি হজের সওয়াব পাওয়া যায়?