শক্রবার ১৭ এপ্রিল ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বঙ্গাব্দ
জাতীয়

পোড়া মার্কেটে ৩১ কোটির ‘আলু পোড়া’

নবীন নিউজ, ডেস্ক ১৪ নভেম্বার ২০২৪ ০১:২৪ পি.এম

সংগৃহীত ছবি

কারও ঘর পোড়ে, কেউ তাতে আগুন পোহায়, কেউ আলু পোড়া খেতে যায়, আবার কেউ বা সেই আগুনে খই ভেজে খেতে চায়। বাংলা এই প্রবাদের মতোই যেন রাজধানীর মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেটে গত বছর লাগা ভয়াবহ আগুনে আলু পুড়িয়েছেন (ফায়দা নিয়েছেন) ওই এলাকার সদ্য সাবেক কাউন্সিলর সলিমউল্লাহ সলু। 

আগুনে পুড়ে যাওয়া কৃষি মার্কেটের ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণ দিতে মোটা অংকের টাকা বরাদ্দ করে সরকার। ঘটা করে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসন থেকে ক্ষতিপূরণের চেকও হস্তান্তর করা হয়।

কিন্তু সেই চেকের টাকা প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কোনো ব্যবসায়ী নিতে পারেননি, গিয়েছে কাউন্সিলর সলুর পকেটে। তবে এখানেই শেষ নয়, নতুন মার্কেটে দোকান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অন্তত ২ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর সলিমউল্লাহ সলু।

অনুসন্ধানে জানা যায়, আগুনে পুড়ে যাওয়ার পর কৃষি মার্কেটের ৩২৭ জন বৈধ দোকানির নামে তিন কিস্তিতে ক্ষতিপূরণের টাকা বরাদ্দ করে সরকার। প্রত্যেক ব্যবসায়ীর নামে অন্তত ৬৫ হাজার টাকার চেক ছাড় করা হয়। সে হিসেবে ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণের ২ কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নিয়েছেন কাউন্সিলর সলু।

এছাড়া পোড়া মার্কেটের জায়গায় নতুন মার্কেট গড়ে সেখানে দোকান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চারশোর বেশি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নিয়েছেন ১ লাখ করে মোট ৪ কোটি টাকা। আর পোড়া মার্কেটের জায়গায় নির্মাণাধীন অবৈধ মার্কেটে নতুন শতাধিক দোকান অন্তত ২৫ কোটি টাকায় বিক্রি করেছেন। সব মিলিয়ে আগুনে পোড়া মার্কেট থেকে ৩১ কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে সলিমউল্লাহ সলুর।

এই টাকার একটি অংশ দিয়ে কৃষি মার্কেটের জায়গায় অবৈধ ভবন গড়ে তুলছেন সাবেক এই কাউন্সিলর। তিনি কৃষি মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ও আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা। সিটি করপোরেশনের জায়গায় কাউন্সিলর ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করলেও করপোরেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, বিষয়টি তাদের জানা নেই।

তবে ডিএনসিসির একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, করপোরেশনের কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশেই ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণের টাকা আত্মসাৎ ও সেখানে অবৈধ ভবন গড়ে তোলা হচ্ছে। কেননা দিন দুপুরে নির্মাণকাজ চললেও ডিএনসিসি বা এর আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে কোনো বাধা দেওয়া হয়নি। সরকারি জায়গা দখল করে এভাবে ভবন নির্মাণের কাজ একদিনের জন্যও বন্ধ ছিল না। অথচ টুকটাক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদেও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং সিটি করপোরেশনসহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নতুন মার্কেট নির্মাণের জন্য পরিকল্পিতভাবে কৃষি মার্কেটে আগুন দেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘদিন থেকেই কৃষি মার্কেট ভেঙে বহুতল মার্কেট করার পরিকল্পনা করছিলেন মার্কেট সমিতির এবং আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা। কিন্তু নানা জটিলতায় তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। তাই মার্কেটে পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানো হয়। কিন্তু ওই এলাকার সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলাম এবং সলিমউল্লাহ সলুর ক্ষমতার দাপটে এখনো ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের কেউ প্রকাশ্যে মুখ খোলার সাহস পাচ্ছেন না। এসব বিষয়ে কথা বললে মার্কেটে নতুন দোকান পাওয়া বা ভবিষ্যতে সেখানে ব্যবসা করা দুরূহ হয়ে পড়বে বলে ধারণা তাদের।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ক্ষতিগ্রস্ত এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘সাবেক কাউন্সিলর সলিমউল্লাহ সলু জাহাঙ্গীর কবির নানকের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তার কথার ওপর কেউ কোনো কথা বলতে পারতো না। তাই তিনি যা বলেছেন, তাই হয়েছে। এখন হয়ত তারা নেই, কিন্তু তাদের লোকজন রয়ে গেছে। সিটি করপোরেশনের যেসব কর্মকর্তা তাদের সহায়তা করেছেন, তারা এখনো বহাল তবিয়তে।’

ক্ষতিগ্রস্ত আরেক ব্যবসায়ী বলেন, ‘কৃষি মার্কেট সরকারি, তাই সেখানে নতুন মার্কেট তৈরির নির্মাণ ব্যয় সরকারের বহন করার কথা। কিন্তু ব্যবসায়ীদের বোঝানো হয়, সরকার নির্মাণ করলে অনেক সময় লাগবে। নিজেরা টাকা দিয়ে নির্মাণ করলে কেউ কিছু করতে পারবে না, কেননা মেয়র-কাউন্সিলর-এমপি সবারই সায় ছিল এতে। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনেক ব্যবসায়ী টাকা দিতে বাধ্য হয়েছেন।’

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের সরকারের দেওয়া ক্ষতিপূরণের টাকা আত্মসাতের চিত্র তুলে ধরেন আরেক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসন থেকে তিন দফায় ক্ষতিপূরণের টাকার চেক দেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীরা তা গ্রহণও করেছেন, এইটুকু সবাই দেখেছে। কিন্তু অনুষ্ঠানের অতিথিরা সবাই চলে যাওয়ার পর এসব চেক সব ব্যবসায়ীর কাছ থেকে স্বাক্ষর নিয়ে রেখে দেয় কাউন্সিলর সলুর লোকজন। কাউন্সিলর ও মার্কেট কমিটির সভাপতির একচ্ছত্র ক্ষমতা থাকায় কেউ ‘টু’ শব্দটি করারও সাহস পাননি।’

এই ব্যবসায়ী আরও বলেন, ‘নতুন মার্কেট নির্মাণে সিটি করপোরেশন থেকে কোনো বরাদ্দ না দিলেও কাউন্সিলর সলু যাদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন তাদের দোকান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি শতাধিক বাড়তি দোকান তৈরি করছেন।’

অবশ্য আরেক ব্যবসায়ীর ভাষ্য, দ্রুত দোকান পাওয়ার আশায় অনেক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী স্বেচ্ছায়ই সলুকে টাকা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সবাই যে ভয়ে টাকা দিয়েছেন, তা সঠিক নয়। আমাদের সব পুড়ে গেছে, তাই দ্রুত সময়ে দোকান পাওয়ার আশায়ও অনেকেই টাকা দিয়েছি। তাদের (সলু ও তার লোকজন) কাছে ক্ষমতা ছিল। নতুন ভবনের অনুমোদন আছে কি নাই, সেটা বড় বিষয় ছিল না।’

গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর ভোর চারটার দিকে কৃষি মার্কেটে আগুন লাগে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আগুন লাগার আগে মার্কেটটিতে মোট ৩১৭টি দোকান ছিল। ক, খ ও গ ব্লকের মধ্যে দুটি ব্লকের সব দোকান পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এরপর সেখানে অস্থায়ীভাবে ছাতা নিয়ে ও তাঁবু টানিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের দোকান চালানোর সুযোগ করে দেয় সিটি করপোরেশন। শর্ত ছিল অস্থায়ীভাবে ব্যবসা পরিচালনার জন্য খোলা জায়গায় চৌকি বসিয়ে ছাতা বা তাঁবুর নিচে দোকান পরিচালনা করা যাবে। কিন্তু সেখানে এখন প্রকাশ্যে নির্মাণ হচ্ছে তিনতলা ভবন।

সম্প্রতি দেখা গেছে, পুড়ে যাওয়া মার্কেটের তিনটি ব্লকেরই নীচতলার নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় তলায় নির্মাণকাজ চলছে। এরই মধ্যে নিচতলায় অনেকেই দোকান পেতে ব্যবসা শুরু করেছেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আনোয়ার পারভেজ নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘মার্কেট বৈধ কি অবৈধ সেটা তো আমরা জানি না। এখানে সবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে কাউন্সিলর মার্কেট নির্মাণ করে দিয়েছেন, আমরা দোকান পেতেছি।’

অবশ্য এভাবে সেখানে ভবন নির্মাণের আইনগত কোনো বৈধতা নেই বলে জানিয়েছেন সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট শাখার এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, মার্কেট নির্মাণের জন্য করপোরেশনের আলাদা সেল রয়েছে। সেখান থেকে সমীক্ষা শেষে দরপত্র আহবান করা হয়। এরপর দোকান বরাদ্দের প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিন্তু কৃষি মার্কেটের ক্ষেত্রে এর কোনোটিই করা হয়নি। এরপরও দিনেদুপুরে কীভাবে এত বড় ভবন নির্মাণ হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ডিএনসিসির অঞ্চল-৫- এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা মোতাকাব্বির আহমেদ বলেন, ‘পুড়ে যাওয়ার পর মার্কেট সমিতির পক্ষ থেকে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে বলে শুনেছি। অনুমোদনের বিষয়টি মার্কেট নির্মাণ সেল বলতে পারবে।’

আর ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মীর খায়রুল আলম বলেন, ‘এই মার্কেটের বিষয়টি নজরে আসার পর আমরা একটি কমিটি গঠন করেছি। কমিটির রিপোর্ট পাওয়ার পর এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারবো।’

পরে ওই কমিটির প্রধান ড. মাহে আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমাদের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। খুব শিগগিরই রিপোর্ট জমা দেব।’ এর বেশি কিছু বলতে রাজি হননি তিনি।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় ঘটা সহিংসতার মামলায় গ্রেপ্তারের পর সাবেক কাউন্সিলর সলিমউল্লাহ সলু বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তাই অবৈধভাবে মার্কেট নির্মাণের অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে মার্কেট কমিটির প্রভাবশালী নেতাদের বেশিরভাগই আত্মগোপনে আছেন, যে কারণে তাদের বক্তব্যও নেওয়া সম্ভব হয়নি। 

নবীন নিউজ/জেড

এই সম্পর্কিত আরও খবর

আরও খবর

news image

ভোট দিতে পারছেন না জিএম কাদের ও আখতারুজ্জামান

news image

আপনারা কেন্দ্রে গিয়ে নির্ভয়ে ভোট দিন: সেনাপ্রধান

news image

বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষ, আহত ৫ জন

news image

ইভ্যালির রাসেল-শামীমা গ্রেফতার

news image

সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্বাচনী সভা-সমাবেশ ও প্রচারণা নিষিদ্ধ

news image

মোসাব্বির হত্যার ঘটনায় প্রধান শুটারসহ গ্রেফতার ৩ জন

news image

ওসমান হাদীর মেডিকেল বোর্ডের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি

news image

গুলিবিদ্ধ হাদির সঙ্গে থাকা রাফি জানালেন পুরো ঘটনার বিবরণ

news image

মোহাম্মদপুরে মা-মেয়ে হত্যায় সেই গৃহকর্মী ঝালকাঠি থেকে গ্রেপ্তার

news image

জামায়াতের ঔষধ হলো আওয়ামী লীগ, বললেন মির্জা আব্বাস

news image

ঘোষণা ছাড়াই সয়াবিনের দাম লিটারে বাড়ল ৯ টাকা, খোলা তেল ৫ টাকা

news image

‘জাতীয় নির্বাচন-গণভোট ৮ থেকে ১২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে হবে’

news image

শেখ হাসিনার ৫-রেহানার ৭ বছরের জেল, ২ বছরের কারাদণ্ড পেলেন টিউলিপ

news image

সচিবালয়ে আগুন

news image

খুলনা আদালত চত্বরে গুলিতে ২ জন নিহত

news image

ফের ভূমিকম্পে কেঁপে উঠলো দেশ

news image

১ লাখের স্কুটারে জরিমানা ২১ লাখ!

news image

ভোরের আলো ফুটতেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে কড়াইল বস্তির আগুনের ক্ষতচিহ্ন

news image

দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন খালেদা জিয়া

news image

ফের ভূমিকম্প

news image

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবন কি এখানেই শেষ?

news image

শেখ হাসিনাকে ফেরত দিতে ভারতকে চিঠি দেবে বাংলাদেশ

news image

শেখ হাসিনার মামলার পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ কী

news image

রায় শুনে যা বললেন শেখ হাসিনা

news image

হাজারীবাগ বেড়িবাঁধে বাসে আগুন

news image

ঢাকা ও আশপাশের জেলায় ১৪ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন

news image

আ.লীগের মামলা তুলে নেয়ার বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেইনি

news image

নারীরা ঘরে সময় দিলে, সম্মানিত করবে সরকার: জামায়াত আমির

news image

রাজধানীতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত ১ জন

news image

ভোরে রাজধানীতে দুই বাসে আগুন